মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি হুতিদের

মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি হুতিদের

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ তলানিতে এসে ঠেকেছে। এ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহের আরেক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল–মানদেব প্রণালিও কার্যত এখন ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতির নিয়ন্ত্রণে। এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা। এরই মধ্যে হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি আরও হুমকির মুখে পড়েছে।

ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন নামের সৌদি আরবের ওই সরবরাহ পথে ড্রোন হামলা হয় গত বৃহস্পতিবার। এদিন স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবিতে সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলের দক্ষিণে ওই পাইপলাইন থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। এরপর শুক্রবার সৌদি সরকার জানায়, ইরাক থেকে এ হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির যে অঞ্চল থেকে হামলা হয়েছে, সেটি ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন।

ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে শিল্পনগরী আবকাইককে পশ্চিমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় এই পাইপলাইনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছিল রিয়াদ। গত কয়েক মাসে এই পাইপলাইন দিয়ে দিনে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে, যা বিশ্বের মোট সরবরাহ করা জ্বালানি তেলের ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায় ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হতো এ জলপথ দিয়ে। দিনে চলাচল করত শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ। এখন দিন গড়ে ১৪টি করে জাহাজ চলাচল করছে। এতে যুদ্ধ শুরুর পরপরই রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে যায় জ্বালানি তেলের দাম। প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। সম্প্রতি দাম কিছুটা কমলেও লোহিত সাগরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে উত্তেজনায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রেও ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়ে যায় ডিজেলের দাম।

এখন সৌদি পাইপলাইন বন্ধে তেলের দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সৌদি বিশ্লেষক খালেদ বারতাফি আল–জাজিরাকে বলেন, এই পাইপলাইন বন্ধের প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। এটি বন্ধের কারণে বাজার থেকে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরে যাবে। এটি পুরো বিশ্বের সমস্যা। ইরান যদি হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মানদেব প্রণালিও বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে এর মূল্য পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন কিছু করা প্রয়োজন।

অভিযোগের আঙুল ইরানের দিকে

ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার দায় কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি। রিয়াদ জানিয়েছে, হামলার পেছনে কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে বড় পরিসরে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। বাগদাদের অনুরোধে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পাল্টা হামলা চালাবে না। এর বদলে সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাক থেকে চালানো হামলা ঠেকাতে বাগদাদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা হবে।

যেহেতু হামলাটি ইরাকে ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল থেকে হয়েছে, তাই অভিযোগের আঙুল তেহরানের দিকেই উঠছে। হামলার পর ইরানের সঙ্গে শালামচেহ সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে বাগদাদ। এ ছাড়া গতকাল আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, পাইপলাইনে হামলার পেছনে ইরানের হাত থাকতে পারে।

ইরানের যুক্ত থাকার পেছনে যৌক্তিক কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরাও। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভলফগ্যাং পুস্তাই আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের হয়ে কাজ করা ইরাকি গোষ্ঠীগুলো পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর নির্দেশ সম্ভবত তেহরান থেকে দেওয়া হয়েছে। এ হামলা চালিয়ে তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লড়াই করা হুতিদের সহায়তা করেছে। তেহরান-সমর্থিত হুতিদের লক্ষ্য হলো ইয়েমেন থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী বিতাড়িত করা।