বর্তমানে দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) ক্যাশ আউট সেবা ও বাংলা কিউআর কোডের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু অসাধু দোকানদার ও চক্র কোনো ধরনের পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই বাংলা কিউআর ব্যবহার করে নিয়মবহির্ভূতভাবে মার্চেন্ট পেমেন্ট নিচ্ছেন। সাধারণ গ্রাহকেরা এমএফএস এজেন্ট পয়েন্টে ক্যাশ আউট করতে গেলে তাদের বিভ্রান্ত করে এজেন্ট অ্যাকাউন্টের পরিবর্তে বাংলা কিউআর-এর মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্ট করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অবৈধভাবে ক্যাশ আউট করিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মে সম্পূর্ণ অবৈধ।
অধিক লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা এই অনৈতিক কার্যকলাপে জড়ালেও, না বুঝে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বহু সাধারণ গ্রাহক মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের মতো গুরুতর ঝুঁকিতে পড়ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে এমএফএস এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাংলা কিউআর কোড স্থাপনের পর এই প্রবণতা আরও বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বাংলা কিউআর ব্যবস্থার অপব্যবহার করে অবৈধ ক্যাশ আউটের বেশ কিছু ঘটনা ইতোমধ্যে নজরে এসেছে। সম্প্রতি একটি ব্যক্তিগত এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মাত্র দুই দিনে (১৬-১৭ আগস্ট) ৭টি লেনদেনে চার প্রতিষ্ঠানের চার বাংলা কিউআর-এ প্রায় ৩৫ লাখ টাকা পেমেন্ট করার তথ্য পাওয়া গেছে। এই কিউআর কোডগুলো বরিশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং হবিগঞ্জ—এই তিন জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছিল। পেমেন্টগুলো করা হয়েছিল দুটি ব্যাংকের বসানো কিউআর-এর মাধ্যমে। অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট বিশ্লেષণে দেখা যায়, এর আগে এই অ্যাকাউন্টে এত বড় অংকের পেমেন্ট লেনদেন ছিল না।
কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে গ্রাহকের কোনো খরচ না থাকলেও, এজেন্টরা ক্যাশ আউটের উদ্দেশ্যে এই অর্থ গ্রহণ করায় গ্রাহকের কাছ থেকে ঠিকই ক্যাশ আউট চার্জ কেটে রাখছেন। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট মূলত তিনটি অপরাধ করছেন: ১. কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই পেমেন্ট গ্রহণ। ২. পেমেন্টে চার্জ না থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউট চার্জ আদায়। ৩. ক্যাশ আউটের ওপর সরকার নির্ধারিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া।
অবৈধ ক্যাশ আউট রোধে অতীতে একই দোকানে এজেন্ট ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট দেওয়া থেকে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো বিরত থাকত। কিন্তু বাংলা কিউআর চালুর পর বিভিন্ন ব্যাংক যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে কিউআর স্থাপন করায় অসাধু চক্র এর সুযোগ নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১ অক্টোবর থেকে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) শূন্য করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ফি না থাকার এই সুবিধাটিকে পুঁজি করে অসাধু চক্র আরও বেশি অবৈধ ক্যাশ আউটের পথ বেছে নিতে পারে, যা ডিজিটাল লেনদেনের সামগ্রিক ইকোসিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এ ধরনের অবৈধ লেনদেনের কারণে বড় ধরনের আইনি সংকট তৈরি হতে পারে। পণ্য বা সেবা না কিনে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট দেওয়ায় আইন অনুযায়ী এটি ‘মানি লন্ডারিং’ হিসেবে গণ্য হবে। এর দায় অ্যাকোয়ারিং কোম্পানি, মার্চেন্ট বা এজেন্ট এবং গ্রাহক—তিন পক্ষের ওপরই বর্তাতে পারে। পাশাপাশি, ব্যবসায়ীদের অ্যাকাউন্ট বাতিল হওয়া এবং জুয়া, হুন্ডি বা অনলাইন প্রতারণার মতো চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১০ আগস্ট ও ১ এপ্রিলের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো মার্চেন্টের অস্বাভাবিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং কিউআর পয়েন্টে ক্যাশ আউট কার্যক্রম দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের কিউআর তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করতে হবে। এমএফএস এজেন্টদের ব্যবসায়িক মডেল ও বাস্তব দিক বিবেচনা না করে যত্রতত্র কিউআর স্থাপন রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

